বয়লার বিস্ফোরণে সাড়ে পাঁচ বছরে নিহত ৬৯
দেশে কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে গত সাড়ে পাঁচ বছরে ৬৯ জন নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন ২৩৭ জন। ২০১২ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ার এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে। শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল বুধবার গবেষণাটি প্রকাশ করা হয়।
সরকারের প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের একাধিক প্রকৌশলী বলেছেন, অনুমোদনের চেয়ে বেশি চাপে বয়লার চালানোর জন্যই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। আর এ জন্য কারখানার অসতর্কতা এবং অদক্ষতাই দায়ী।
বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বয়লার বিস্ফোরণে এতগুলো প্রাণ হারিয়ে গেলেও একটিতেও দায়ী ব্যক্তিরা সাজা পাননি।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানেও একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনায় কারও সাজা পাওয়ার প্রমাণ মেলেনি।
বছরের প্রথম ছয় মাসে সর্বোচ্চ মৃত্যু
বিলসের গবেষণায় দেখা যায়, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩৩টি বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে মারা যান ৪১ জন। এ সময়ে আহত হন ২৩৭ জন। আর এ বছর দুটি দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ২৮ জন নিহত হয়েছেন।
বিলসের গবেষণায় দেখা যায়, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩৩টি বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে মারা যান ৪১ জন। এ সময়ে আহত হন ২৩৭ জন। আর এ বছর দুটি দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ২৮ জন নিহত হয়েছেন।
গত সোমবার গাজীপুরের কাশিমপুরের নয়াপাড়া এলাকার মালটিফ্যাবস লিমিটেড নামের পোশাক কারখানার বয়লারে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ১৩ জন শ্রমিক নিহত হন। আহত হন অর্ধশতাধিক শ্রমিক ও পথচারী। এ দুর্ঘটনায় সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা হিসেবে এযাবৎ ছাড়পত্র ছাড়া বয়লার চালানোর দায়ে মালটিফ্যাবস কর্তৃপক্ষের জরিমানা করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়। তবে জরিমানার পরিমাণ মাত্র ২০ হাজার টাকা। জরিমানা নোটিশটি গত মঙ্গলবার মালটিফ্যাবসের নামে ইস্যু করেছে প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়।
বয়লার বিস্ফোরণে দোষী ব্যক্তিদের সাজা হয় না
গত সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এ বছরের ১৯ এপ্রিল। দিনাজপুর সদর উপজেলার রানীগঞ্জে যমুনা অটোমেটিক রাইস মিলের বয়লার বিস্ফোরিত হয়ে ২৮ জন দগ্ধ হন। এ ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৮ শ্রমিকের। গত সাড়ে পাঁচ বছরে বয়লার বিস্ফোরণে কোনো একক ঘটনায় এ সংখ্যাই সর্বোচ্চ।
গত সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এ বছরের ১৯ এপ্রিল। দিনাজপুর সদর উপজেলার রানীগঞ্জে যমুনা অটোমেটিক রাইস মিলের বয়লার বিস্ফোরিত হয়ে ২৮ জন দগ্ধ হন। এ ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৮ শ্রমিকের। গত সাড়ে পাঁচ বছরে বয়লার বিস্ফোরণে কোনো একক ঘটনায় এ সংখ্যাই সর্বোচ্চ।
দিনাজপুরের বয়লার বিস্ফোরণের পর ২৪ এপ্রিল কোতোয়ালি থানায় যমুনা অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক সুবল ঘোষসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহত শ্রমিকদের একজনের স্ত্রী। দিনাজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ২ জুলাই দিনাজপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালত থেকে এই তিনজন জামিন পেয়েছেন।
গত বছরের ১৬ জুলাই নওগাঁ সদর উপজেলার লস্করপুর এলাকার টুম্পা রাম রাইস মিলে বয়লার বিস্ফোরণে দুই শ্রমিক নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন সাতজন।
নওগাঁর সদর থানার ওসি তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে গতকাল বুধবার বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছিল। মামলার তদন্তের চালকল মালিক, ব্যবস্থাপকসহ সাতজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ফোরম্যানকে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনি জামিনে মুক্তি পান। ওসি বলেন, ‘নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিষয়টি মালিক ও ভুক্তভোগীদের পরিবার মীমাংসা করে ফেলে। আর আহত সাতজনকে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।’
বয়লার বিস্ফোরণের একের পর এক ঘটনা ঘটলেও এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার হচ্ছে না। আবার কারখানার বয়লারগুলো নিয়মিত দেখভালের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয় নামে একটি আলাদা কার্যালয়ই আছে, তাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের অভাবকে দায়ী করা হয়। তবে কার্যালয় সূত্রগুলো বলেছে, এই সাড়ে পাঁচ হাজার বয়লার পরিদর্শনের জন্য মাত্র পাঁচজন পরিদর্শক আছেন। এই অপ্রতুলতাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ কার্যালয়ের বয়লার পরিদর্শক মো. শরাফত আলী জানান, তৈরি পোশাকশিল্প, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, কেমিক্যাল কোম্পানি, চালকল ও ট্যানারি শিল্পে বয়লার ব্যবহার হয়ে থাকে। পোশাকশিল্পে ইস্তিরি বা শুকানোর কাজে এবং অন্যান্য শিল্পে উৎপাদিত দ্রব্য শুকানোর কাজেই সাধারণত বয়লার ব্যবহার হয়। তিনি জানান, ২২ দশমিক ৭৬ লিটারের বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনো বয়লার হলেই তা নিবন্ধন করতে হয়। সেই অনুযায়ী দেশে বয়লার আছে সাড়ে পাঁচ হাজার।
অদক্ষতা ও সতর্কতার অভাব
অনুমোদনের চেয়ে বেশি মাত্রায় চাপে বয়লার পরিচালনাকেই এ দেশে বয়লার বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধান বয়লার পরিদর্শক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান। দিনাজপুর এবং গত সোমবারের গাজীপুরের বড় দুই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, দুটি ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত চাপে বয়লার পরিচালনার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটেছে অসতর্কতার জন্য এবং অদক্ষতার জন্য। বয়লার পরিদর্শকের সংখ্যা একেবারেই কম হওয়ায় প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ হয় না।
অনুমোদনের চেয়ে বেশি মাত্রায় চাপে বয়লার পরিচালনাকেই এ দেশে বয়লার বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধান বয়লার পরিদর্শক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান। দিনাজপুর এবং গত সোমবারের গাজীপুরের বড় দুই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, দুটি ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত চাপে বয়লার পরিচালনার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটেছে অসতর্কতার জন্য এবং অদক্ষতার জন্য। বয়লার পরিদর্শকের সংখ্যা একেবারেই কম হওয়ায় প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ হয় না।
বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, বয়লার পরিদর্শকের নগণ্য সংখ্যা এবং একটিও শাস্তির দৃষ্টান্ত না থাকা একটি বিষয় প্রমাণ করেছে। তা হলো শ্রমজীবী মানুষের প্রতি রাষ্ট্রীয় অবজ্ঞা এখন একটি কুৎসিত রূপ নিয়েছে। এখনো একজন শ্রমিক নিহত হলে মাত্র এক লাখ টাকা দিয়ে পার পান মালিক। এ আইনের পরিবর্তন দরকার।
জানতে চাইলে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক বলেন, দ্রুত বয়লার পরিদর্শকের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। আবার পরিদর্শনের সময় বয়লারে ত্রুটি পেলে বিপুল পরিমাণ জরিমানা করতে হবে।
বিস্ফোরণে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি না হওয়ার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় জটিলতা আছে। এর ফলে মামলাগুলো বেশি দিন চলে না। এ প্রক্রিয়ার জটিলতা কমাতে পারলেই শাস্তির নিশ্চিত হবে।

No comments :
Write comments